কখনো কি মনে হয়েছে, ঠিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই সবকিছু গন্ডগোল হয়ে যায়? কলমের কালি শেষ, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, কিংবা শেষ মুহূর্তে ট্রাফিক ছেড়ে দেওয়া-এই অদ্ভুত ঘটনাগুলোর একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। একে বলা হয় মার্ফি’স ল। এই লেখায় সহজ ভাষায়, বাস্তব গল্পের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে কেন ‘যা খারাপ হতে পারে, তা খারাপ হবেই’।
"বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচের পেনাল্টি চলছে, আর তখনই কারেন্টটা চলে গেল! ধুররর! " অথবা " পরীক্ষার হলে ঠিক ওই কলমটারই কালি শেষ হয়ে গেলো যেটা দিয়ে আপনি দ্রুত লিখতে পারেন " অথবা অনেকক্ষণ ট্রাফিক জ্যামে বসে থেকে যেই রিক্সা থেকে নামলেন হেঁটে যাবেন বলে, ওমনি জ্যাম ছেড়ে দিলো!!! তখন আপনার মনে হয় পুরো দুনিয়াটা বুঝি আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তাই না? কিন্তু আপনি একা নন। এই অদ্ভুত ঘটনার একটা নাম আছে। একে বলা হয় "মার্ফি'স ল" (Murphy's Law)। আর এর পেছনের ইতিহাসটা কোনো থ্রিলার মুভির চেয়ে কম না। সিনটা কল্পনা করুন। ১৯৪৯ সাল । আমেরিকার এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেস। মরুভূমির মাঝখানে এক গোপন প্রজেক্ট চলছে। নাম-প্রজেক্ট MX981। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করছেন একজন মানুষ সর্বোচ্চ কতটুকু গতি বা 'জি-ফোর্স' সহ্য করতে পারে। এজন্য তারা একটা রকেট স্লেড বানিয়েছেন, নাম দিয়েছেন "জি হুইজ" (Gee Whiz)। জিনিসটা একটা রকেটের মতো মাটির ওপর দিয়ে ছুটে চলে। সেই স্লেডে বসলেন সাহসী কর্নেল জন পল স্ট্যাপ। তার শরীরে ১৬টা সেন্সর লাগানো হলো, যাতে বোঝা যায় তার শরীরের ওপর কতটা চাপ পড়ছে। রকেট স্টার্ট হলো। ধুলোর ঝড় উড়িয়ে সেটা অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে গেল এবং ব্রেক কষল। কর্নেলের হাড়গোড় প্রায় ভেঙে যাওয়ার দশা। তিনি রক্তচক্ষু নিয়ে বের হয়ে এলেন।
বিজ্ঞানীরা দৌড়ে গেলেন ডেটা চেক করতে। এবং এখানেই গল্পের প্রথম টুইস্ট! ১৬টা সেন্সরের সবকয়টি রিডিং দেখাচ্ছে - শূন্য! মানে এত বড় একটা রিস্কি এক্সপেরিমেন্ট হলো, অথচ কোনো ডেটাই রেকর্ড হলো না? ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড মার্ফি চেক করতে গিয়ে দেখলেন, যে টেকনিশিয়ান সেন্সরগুলো লাগিয়েছিল, সে ১৬টা সেন্সরই উল্টো করে লাগিয়েছে! এক-দুটা না, সবগুলো! হতাশ হয়ে ক্যাপ্টেন মার্ফি তখন সেই ঐতিহাসিক কথাটা বলেছিলেন: "কোনো কাজ যদি ভুল করার ১টি উপায়ও থাকে, তবে কেউ না কেউ সেই ভুলটা করবেই।" সেই থেকেই জন্ম হলো মার্ফি'স ল- "যা খারাপ হতে পারে, তা খারাপ হবেই।" এখন আপনি ভাবতে পারেন, এটা তো সামান্য ভুলের গল্প। কিন্তু দাঁড়ান, ছোট ভুল কীভাবে ১২৫ মিলিয়ন ডলার বা হাজার কোটি টাকা পানিতে ফেলে দিতে পারে, সেই গল্পটা শুনুন। ১৯৯৯ সাল। নাসা খুব ধুমধাম করে মঙ্গলে একটা স্পেসশিপ পাঠাল—'মার্স ক্লাইমেট অরবিটার'। ৯ মাস ধরে মহাকাশে জার্নি করে সেটা মঙ্গলের কাছে পৌঁছাল। নাসার কন্ট্রোল রুমে সবাই শ্যাম্পেইন খোলার জন্য রেডি। কিন্তু হঠাৎ সিগন্যাল গায়েব। স্পেসশিপটা মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কেন জানেন? এলিয়েন অ্যাটাক? না বস। স্পেসশিপটা যারা বানিয়েছিল (লকহিড মার্টিন), তারা হিসেব করেছিল 'পাউন্ড' বা ইংলিশ এককে। আর নাসার বিজ্ঞানীরা হিসেব করছিলেন 'নিউটন' বা মেট্রিক এককে। চিন্তা করুন অবস্থাটা! এক দল ভাবছে ইঞ্চি, আরেক দল ভাবছে সেন্টিমিটার।
এই ছোট কমিউনিকেশন গ্যাপের কারণে হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট চোখের পলকে শেষ! একেই বলে মার্ফির থাবা। আরেকটা শুনবেন? ২০০৪ সালে লস এঞ্জেলেসে একটা কনসার্ট হল বানানো হলো- ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হল। দেখতে অসম্ভব সুন্দর, পুরোটা চকচকে স্টিল দিয়ে মোড়ানো। কিন্তু আর্কিটেক্ট ফ্রাঙ্ক গেহরি একটা জিনিস খেয়াল করেননি। বিল্ডিংয়ের কার্ভ করা স্টিলগুলো কাজ করতে শুরু করল বিশাল আতশ কাঁচের মতো। সূর্যের আলো রিফ্লেক্ট হয়ে রাস্তার উল্টো পাশের ফুটপাতে এবং বিল্ডিংয়ে পড়তে লাগল। তাপমাত্রা পৌঁছে গেল ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে! রাস্তার পাশে রাখা প্লাস্টিকের ডাস্টবিন গলে যেতে লাগল, মানুষের গাড়ির বাম্পার গলে গেল, ড্রাইভাররা ওই আলোতে অন্ধ হয়ে এক্সিডেন্ট করতে লাগল। শেষে সেই সুন্দর স্টিলগুলোকে ঘষে ম্যাট বা খসখসে করে দিতে হলো। বিল্ডিং বানাতে গিয়ে তারা বানিয়ে ফেলেছিল একটা 'ডেথ রে' বা মৃত্যু রশ্মি! এমনকি লন্ডনের মিলেনিয়াম ব্রিজের কথাও ভাবুন। খোলার মাত্র দুই দিন পরে সেটা বন্ধ করে দিতে হলো। কেন? কারণ মানুষ যখন হাঁটত, ব্রিজটা একটু দুলত। আর সেই দুলুনি থামানোর জন্য মানুষ নিজের অজান্তেই ব্রিজের দুলুনির সাথে তাল মিলিয়ে পা ফেলত। এতে দুলুনি আরও বেড়ে যেত! ইঞ্জিনিয়াররা মানুষের এই সাইকোলজিটা ধরতেই পারেননি। এখন আসি আপনার সকালের নাস্তায়। হাত থেকে মাখানো পাউরুটি পড়লে কেন সব সময় জেলি মাখানো দিকটাই নিচে পড়ে কার্পেট নষ্ট করে? ১৯৯৫ সালে রবার্ট ম্যাথিউস নামের এক ফিজিসিস্ট এর উত্তর দিয়ে ইগ-নোবেল প্রাইজ জিতেছিলেন। তিনি দেখান, এটা আপনার কপাল খারাপ না। এটা হলো ফিজিক্স। টেবিলের উচ্চতা সাধারণত এমন হয় যে, পাউরুটি পড়ার সময় বাতাসে মাত্র 'অর্ধেক পাক' খাওয়ার সময় পায়। তাই সোজা দিকটা উল্টে গিয়ে মাখানো দিকটাই নিচে পড়ে।
টেবিল যদি ৩ গুণ উঁচুতে হতো, তবে হয়তো পাউরুটিটা বেঁচে যেত! এই গল্পগুলো থেকে আপনার জন্য লেসন কী? আপনি যখন ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে ভাবেন- "আমার সাথেই কেন এমন হয়?"- তখন মনে রাখবেন, এটা সবার সাথেই হয়। নাসা ভুল করে, বড় আর্কিটেক্ট ভুল করে। মার্ফি'স ল আমাদের ভয় দেখানোর জন্য না, আমাদের প্রস্তুত করার জন্য। কর্নেল জন পল স্ট্যাপ কিন্তু ওই ভুলের পরেও থেমে যাননি। তারা পরের বার সেন্সরগুলো ডাবল চেক করেছিলেন এবং রেকর্ড গড়েছিলেন। তাই জীবনে যখনই কোনো প্ল্যান করবেন, ধরে নেবেন কিছু না কিছু ভুল হতে পারে। ওই ব্যাকআপ প্ল্যানটাই আপনাকে বাঁচাবে। আপনার লাইফটা কোনো জাদুকরি সিনেমা না যে সব কিছু পারফেক্ট হবে। ভুল হবেই। কিন্তু স্মার্ট তো আপনি তখনই হবেন, যখন জেলি মাখানো পাউরুটিটা পড়ার আগেই ধরে ফেলতে পারবেন। ফোনটা রেখে এবার একটু ভাবুন- আগামীকালের পরীক্ষার জন্য আপনার কলমটা ঠিক আছে তো? নাকি মার্ফি চাচা সেখানেও বসে আছে? চেক করে নিন!
